হঠাৎ দেখা: এক মিষ্টি প্রেমের গল্প
ধুলোমাখা তাকে এক মুহূর্তের থমকে যাওয়া
শরতের সেই দুপুরটা ছিল অদ্ভুত। কলেজ স্ট্রিটের চিরন্তন ভিড় আর কোলাহলকে যেন মেঘে ঢাকা আকাশটা কিছুটা হলেও শান্ত করে দিয়েছিল। বাতাসের ধুলো আর পুরনো কাগজের মিষ্টি গন্ধ—সব মিলিয়ে এক মায়াবী পরিবেশ। এই পরিবেশেই তার সবচেয়ে বেশি শান্তি।
অরুণিমা (২৫), ইতিহাসের ছাত্রী, তখন পুরোপুরি মগ্ন একটি পুরোনো বইয়ের দোকানে। দোকানের নামটা প্রায় মুছে গেছে, কেবল ধুলোমাখা সাইনবোর্ডটার দিকে তাকালেই বোঝা যায়—এখানকার বইগুলো কেবল বেচাকেনার জন্য নয়, বরং এক একটা সময়ের দলিল। সে খুঁজছিল ১৮শ শতকের শেষ দিকে লেখা ফরাসি বিপ্লব সংক্রান্ত একটি দুষ্প্রাপ্য সংস্করণ।
দোকানের ভেতরের আলো-ছায়া মেশানো একটি সরু গলিতে প্রবেশ করল অরুণিমা। সারি সারি তাক, সব বইয়ে ঠাসা। প্রতিটি তাকে হাত বুলিয়ে চলছিল সে, যেন ইতিহাসের স্পর্শ খুঁজছে। অবশেষে, একটি উঁচু তাকে, প্রায় কিনারায়, সে দেখতে পেল তার কাঙ্ক্ষিত বইটি।
অরুণিমা সাবধানে হাত বাড়াল। কিন্তু তার অসতর্কতা আর বইটির ভারের কারণে, তাকের কিনারে রাখা একটি ভারী চটি বই, ‘মারাঠাদের উত্থান’—সশব্দে নিচে, পায়ের কাছে পড়ে গেল। অরুণিমা অপ্রস্তুত হয়ে দ্রুত তা তোলার জন্য ঝুঁকেছিল। তার চুল এসে পড়ল মেঝেতে।

ঠিক সেই সময়, অন্যপ্রান্ত থেকে দ্রুত এগিয়ে এলো একটি বলিষ্ঠ হাত।
সেই ‘হঠাৎ দেখা’-র মুহূর্ত!
অরুণিমা যখন বইটা তোলার জন্য হাত বাড়িয়েছে, ঠিক তখনই সেই হাতটি তার হাতের ওপর এসে পড়ল। দুই জোড়া হাত স্পর্শ করল। অরুণিমা সচকিত হয়ে মুখ তুলল, আর সেই মুহূর্তে চারটে চোখ মুখোমুখি হলো।
আকাশ (২৮), একজন তরুণ স্থপতি, তখন ভিড়ের মধ্যে পথ খুঁজতে গিয়ে এই সরু গলিতে প্রবেশ করেছিল। তার চোখেমুখে ছিল কাজের চাপ এবং সময়ের প্রতি এক বিরক্তি। কিন্তু অরুণিমার চোখে সে দেখল এক মুহূর্তের জন্য ছড়িয়ে পড়া গভীর নীরবতা, বিস্ময় এবং এক আশ্চর্য লাজুকতা। তার কালো ডাগর চোখে সেই লাজুকতা যেন মেঘের মধ্যেও এক ঝলক আলোর মতো লেগেছিল।
আকাশ সামান্য হকচকিয়ে গেলেও নিজেকে সামলে নিল। তার মুখে কোনো রাগ বা বিরক্তি ছিল না, ছিল কেবল কৌতূহল মেশানো এক সহজ অভিব্যক্তি।
“দুঃখিত,” অরুণিমা ফিসফিস করে বলল, গাল দুটো সামান্য লাল হয়ে উঠেছে। সে অনুভব করল তার হাতের স্পর্শ, যা কেবল একটি বইকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে। “আমারই ভুল। বইটা… খুব ভারী।”
আকাশ শান্ত গলায় বইটি তুলে অরুণিমার হাতে দিল। বইটির শীতলতার বিপরীতে তার হাতের উষ্ণতা অরুণিমার মনে এক অন্যরকম অনুভূতি জাগাল।
“ঠিক আছে। সাবধানে। এই বইগুলো এমনিতেই খুব নাজুক হয়,” আকাশ বলল। তারপর একটু হেসে জানতে চাইল, “আপনিও কি ইতিহাস ভালোবাসেন?”
“হ্যাঁ, ইতিহাস আমার জগৎ। আর আপনি?” অরুণিমা উত্তর দিল। “আমি স্থাপত্য নিয়ে কাজ করি। পুরোনো স্থাপত্যের ইতিহাস, নকশা, এদের একটা যোগ আছে। তাই হঠাৎ দেখা। আপনার বইটা তুলে দিলাম,” আকাশ কথাটি শেষ করে একটু হাসল।
সেই হাসিটি ছিল সংক্ষিপ্ত কিন্তু স্পষ্ট—তার বাস্তববাদী চরিত্রের মতোই গোছানো। সেদিনের সেই সামান্য কথোপকথন যেন একটা সুরের শুরু করে দিল। আকাশ দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল, যেন আর এক মুহূর্তও দাঁড়ানোর সময় নেই তার।
অরুণিমা দেখল, ছেলেটি ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ মিলিয়ে গেল। তার হাতে তখনও ফরাসি বিপ্লবের বইটি। বইয়ের পাতার গন্ধের সাথে মিশে রইল একটি অচেনা স্পর্শ এবং একটি অচেনা ছেলের বাস্তববাদী কিন্তু মায়াময় হাসি। অরুণিমার মনে হলো, এই ‘হঠাৎ দেখা’-র ঘটনাটি তার ইতিহাসের নোটবুকের একটি বিশেষ অধ্যায় হয়ে থাকবে। সে জানত না, এই সামান্য ভুল থেকেই তাদের জীবনের এক নতুন গল্প লেখা শুরু হলো।
ট্রাম লাইনে কফি কাপের উষ্ণতা
অরুণিমা জানত, কলকাতার মতো ব্যস্ত শহরে কলেজ স্ট্রিটের সেই ভিড়ে আবারও আকাশের সাথে দেখা হওয়া প্রায় অসম্ভব। তবুও অজান্তেই তার মন বইয়ের দোকানের দিকে ছুটে যেত। সে আশা করত, হয়তো কোনো এক পুরোনো তাকের কোণে, কিংবা ইতিহাসের কোনো এক নতুন বইয়ের ভাঁজে আবার সেই মুখটি দেখা যাবে। কিন্তু আকাশকে সে খুঁজে পেল না।
প্রথম দেখার পর কেটে গেছে প্রায় সাতটি দিন। এই সাত দিন অরুণিমা নিজের নোটবুকে সেই দিনের ঘটনাটি বারবার লিখেছে এবং মুছে দিয়েছে। সে জানে, সে এক ‘বাস্তববাদী’ ছেলেকে ভালোবেসে ফেলেছে, যার জীবনের শব্দকোষে সম্ভবত ‘কাকতালীয়’ বলে কিছু নেই।
এক মেঘলা বৃহস্পতিবার। অরুণিমা সেদিন তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার পেপারের জন্য রফি আহমেদ কিদওয়াই রোডের একটি ছোট, পুরোনো ধাঁচের কফিশপে বসেছিল। কফিশপটির নাম ‘কবিতা ক্যাফে’। কাঁচের জানলার বাইরে তখন ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছে, আর মাঝেমধ্যে ট্রামের ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ সেই নীরব দুপুরকে ভেঙে দিচ্ছে। অরুণিমা তখন মন দিয়ে পেপার লিখছিল, আর তার পাশে রাখা ছিল তার প্রিয়, সামান্য ভেজা ডায়েরি।
হঠাৎ দরজায় টুং শব্দ করে কেউ একজন প্রবেশ করল। বাইরের ঠান্ডা বাতাস আর বৃষ্টির জলের ছোঁয়া যেন মুহূর্তের জন্য ভেতরে এলো। অরুণিমা কাজ থেকে চোখ না তুলেও অনুভব করল, কেউ একজন কাউন্টারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু, যখন অরুণিমার পাশে রাখা টেবিলের দিকে এগিয়ে এসে সেই মানুষটি তার ভিজে যাওয়া চশমাটা খুলতে গেল, অরুণিমা চমকে উঠল। সেই আকাশ! ভিজে যাওয়া কালো শার্ট, কাঁধে একটি বড় লেদার ব্যাগ—নিঃসন্দেহে সে।
আকাশ তখন কফি অর্ডার করে পিছন ফিরেছে। হাতে কফির কাপ। তার চোখ টেবিলের দিকে স্থির হতে অরুণিমাকে দেখতে পেল। তার চোখেও সামান্য বিস্ময়, যা দ্রুত এক হাসিতে রূপান্তরিত হলো। সেই হাসি, যা গত সাত দিন ধরে অরুণিমা মনে মনে খুঁজে বেড়াচ্ছিল।
“আরে! আপনি… ইতিহাসের বই?” আকাশ হেসে বলল। তার কণ্ঠে ছিল আন্তরিকতার সুর। “আর আপনি… স্থাপত্যের ভিজে নকশা,” অরুণিমাও মুচকি হেসে জবাব দিল। তার উত্তেজনা গোপন করার জন্য সে দ্রুত কফির কাপে চুমুক দিল।
আকাশের চোখে সেই মুহূর্তের জন্য আর কোনো বিরক্তি বা তাড়াহুড়ো ছিল না। সে অরুণিমার টেবিলের দিকে এগিয়ে এসে বলল, “আপনাকে এখানে দেখব ভাবিনি। অনুমতি দিলে কি বসা যায়? ভিজে গিয়েছি খুব।”
অরুণিমা হাসি চাপতে পারল না, “নিশ্চয়ই, বসুন। এই কফি শপটা একটু অন্যরকম। এখানকার কফিটা দারুণ।”
শুরু হলো দ্বিতীয়বারের কথোপকথন। এইবার আলোচনা বইয়ের তাকে সীমাবদ্ধ থাকল না। আকাশ জানাল তার স্থপতি জীবন, কীভাবে সে পুরোনো দালানগুলোর ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য লড়াই করে। সে স্বপ্ন দেখে, পুরোনো কলকাতা তার আধুনিক রূপের মধ্যেও যেন তার স্বকীয়তা না হারায়। অরুণিমা মুগ্ধ হয়ে শুনল।
অন্যদিকে, অরুণিমা তার স্বপ্নবিলাস নিয়ে কথা বলল। তার বৃষ্টিতে ভেজার অসম্ভব ভালো লাগা, পুরোনো বাংলা সাহিত্য আর ছোটবেলার ডায়েরির কথা।
আকাশ হেসে বলল, “বৃষ্টিতে ভেজা? আমার ঠিক উল্টো। আমি ঘরকুনো। এক মগ কফি হাতে বারান্দায় বসে বৃষ্টি দেখাই আমার শান্তি। আপনাকে দেখলেই মনে হয়, আপনি যেন ভিজে যাওয়া ডায়েরির প্রথম পাতা।”
অরুণিমা হাসল। এই বৈপরীত্যেই যেন তারা একে অপরের প্রতি আরও বেশি আগ্রহী হয়ে উঠল।
আকাশ তার ব্যাগের চেন খুলে একটি জটিল স্থাপত্যের নক্শা বের করল। “এই দেখুন, এই পুরোনো বাড়িটা নিয়ে কাজ করছি। ইতিহাসটা ভালো করে বুঝতে পারছি না। আপনার কি মনে হয়, নকশাটা বেশি বাস্তববাদী হয়ে গেল? এর মধ্যে কি আরও কিছু ‘স্বপ্ন’ মেশানো যেত?”
অরুণিমা তখন নক্শা দেখে মতামত দিল, আর এইভাবেই তাদের চেনা-জানা বন্ধুত্বের দিকে মোড় নিল। কফি কাপের উষ্ণতা ততক্ষণে তাদের মনের মধ্যে এক অন্যরকম অনুভূতির জন্ম দিয়েছে। সন্ধ্যা পেরিয়ে গেল। কফিশপ প্রায় ফাঁকা।
বিদায় নেওয়ার সময় আকাশ বলল, “আপনার ফোন নম্বরটা কি পেতে পারি, ইতিহাসের ছাত্রী? স্থাপত্যের একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টে আপনার সাহায্য দরকার হতে পারে।” তার চোখে ছিল দুষ্টুমি ভরা হাসি, যা অরুণিমাকে বুঝতে সাহায্য করল—এই যোগাযোগটি নিতান্তই কাকতালীয় নয়, বরং এক সযত্ন পদক্ষেপ।
অরুণিমা হাসতে হাসতে ফোন নম্বরটা দিল। কফি শপের কাঁচের জানলায় ট্রাম লাইনের হলুদ আলোয় তাদের বিদায় মুহূর্তটি ফ্রেমবন্দী হলো।
বৈপরীত্যের সেতু
ফোন নম্বর আদান-প্রদানের পর কেটে গেল প্রায় দু’মাস। অরুণিমা ও আকাশের মধ্যে গড়ে উঠল এক মিষ্টি, সরল বন্ধুত্ব। তাদের দু’জনের জগৎ সম্পূর্ণ ভিন্ন হলেও, সেই ভিন্নতা তাদের কাছে আর দূরত্ব তৈরি করল না। বরং, তা হলো আকর্ষণ এবং জানার আগ্রহের উৎস। আকাশ এবং অরুণিমা একে অপরের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু তাদের ভালোবাসা এই বৈপরীত্যের ওপর ভর করেই এক মজবুত সেতু নির্মাণ করছিল।
তাদের প্রতিদিনের কথোপকথনগুলো ছিল অনেকটা এরকম:
অরুণিমা গভীর রাত পর্যন্ত পুরোনো ইতিহাসের বই ঘাঁটত, অতীতের রোমাঞ্চ নিয়ে বিভোর থাকত। অন্যদিকে, আকাশ তখন ল্যাপটপে তার প্রজেক্টের কাজ শেষ করে ভোর রাতে অরুণিমাকে মেসেজ করত, “তোমার রাজকন্যার গল্পটা আজ কোথায় পৌঁছাল, জানতে বড় ইচ্ছে করছে। স্থাপত্যের নকশায় তোমার গল্পের মতো কোনো বাঁক নেই কেন, বলো তো?”
আকাশ কোনো পুরোনো স্থাপত্যের ভাঙন দেখলে রেগে যেত, তার চাপা স্বভাবের মধ্যে ফুটে উঠত তীব্র যন্ত্রণা। অরুণিমা তখন তার মন শান্ত করার জন্য রবীন্দ্রসংগীতের লিংক পাঠাত, আর বলত, “সব ভেঙে গেলেই বা ক্ষতি কী? নতুন কিছু তৈরির সুযোগ আসে তো! আর পুরোনো জিনিস তো আমাদের মনে থেকে যায়, আকাশের থেকেও বেশি স্থায়ী।”
আকাশ পাল্টা উত্তর দিত, “স্মৃতি নিয়ে বাড়ি তৈরি করা যায় না, অরুণিমা। দালান তৈরি করতে লাগে সিমেন্ট আর লোহা। আর তুমি? তুমি তো কেবলই স্মৃতি আর স্বপ্নে বাঁচতে ভালোবাসো।”

এই মিষ্টি তর্ক তাদের সম্পর্কের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠল। তাদের মধ্যে একটি ছোট্ট রোমান্টিক তর্ক প্রায় চলত—
অরুণিমা: “আপনি এত বাস্তববাদী কেন? একটু স্বপ্ন দেখুন! বৃষ্টিতে ভেজার মজাটাই তো আলাদা। পৃথিবীটা তো কেবলই কালো আর সাদা নয়, আকাশ। এর মধ্যে রামধনুর রং আছে।”
আকাশ: “স্বপ্ন দেখতে দেখতেই তো দুনিয়ার সব পুরোনো জিনিস ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। আমি স্থপতি, আমার কাজ বাস্তবকে ধরে রাখা। আর বৃষ্টিতে ভিজলে জ্বর হয়, ইতিহাস! বাস্তববাদী হন।”
কিন্তু এই তর্কের মধ্যেই তারা দু’জনের প্রতি অকৃত্রিম যত্ন এবং ভালোবাসা খুঁজে পেত। একদিন অরুণিমার খুব জ্বর হলো। সে এতটাই অসুস্থ ছিল যে কফি শপে যাওয়া বা কথা বলার মতো শক্তিও ছিল না। আকাশ তার কাজের সমস্ত ব্যস্ততা ফেলে, নিজের তৈরি করা সব ‘বাস্তবতার নিয়ম’ ভেঙে, ট্যাক্সি করে তার জন্য কফিশপ থেকে পছন্দের স্যান্ডউইচ আর গরম কফি নিয়ে হাজির হলো।
অরুণিমা অবাক হয়ে দেখল, এই বাস্তববাদী ছেলেটি তার জন্য এক হাতে কফির কাপ এবং অন্য হাতে একটি অ্যান্টিবায়োটিকের প্যাকেট নিয়ে এসেছে। “এ কী, আপনি? কাজ ফেলে?” অরুণিমা ফিসফিস করে বলল। “জ্বর হলে বাস্তববাদী হওয়া যায় না,” আকাশ নরম স্বরে জবাব দিল। “জ্বর হলে যত্ন নিতে হয়, সেটাই আসল বাস্তবতা। ওষুধ খান, আর চুপ করে শুয়ে থাকুন।” সেই দিন অরুণিমা বুঝল, আকাশের কঠোর বাস্তববাদী আবরণের নিচে লুকিয়ে আছে এক স্নিগ্ধ, যত্নশীল হৃদয়।
অন্যদিকে, অরুণিমা একদিন আকাশের অফিসের কাজে সাহায্য করতে গিয়ে দেখল, সে সারাদিন না খেয়ে প্রজেক্টের কাজ করছে। তার নিজের অফিসের ক্যান্টিনের খাবারও তার পেটে যায়নি। অরুণিমা তখন মায়ের কাছ থেকে শিখে জোর করে নিজের হাতে বানানো আলুর দম আর লুচি নিয়ে গেল।
“এ কী, আমার জন্য?” আকাশ অবাক হলো। “হ্যাঁ। সারাদিন কাজ করবেন আর খাবেন না? ইতিহাসের ছাত্রীরা কেবল অতীত নিয়ে গবেষণা করে না, তারা বর্তমানেও যত্ন নিতে জানে,” অরুণিমা হাসল।
আকাশ সেই খাবার খেয়ে মুগ্ধ হলো। সে বুঝল, অরুণিমার স্বপ্নবিলাস কেবল কল্পনায় নয়, তার যত্ন এবং ভালোবাসার মধ্যেও মিশে আছে। এই দু’মাস ধরে তারা একে অপরের অভ্যাস, দুর্বলতা এবং আবেগগুলোকে সম্মান করতে শিখেছে।
এই অধ্যায়ের শেষের দিকে তারা বুঝতে পারল—এই সম্পর্ক কেবল বন্ধুত্ব নয়, এর গভীরে অন্য কিছু লুকিয়ে আছে। একটি শরৎ সন্ধ্যায় গঙ্গার পারে বসে তারা পুরোনো গল্প করছিল। আকাশে তখন চাঁদ নেই, কিন্তু নদীর জলে শহর আলোকিত। অরুণিমা দেখল, আকাশের চোখ দুটো নদীর আলোর ছটায় চিকচিক করছে।
অরুণিমা সাহস করে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কেবলই আমার ইতিহাসের বইয়ে হাত দিতে এসেছিলেন? নাকি অন্য কোনো ইতিহাস তৈরি করতে?”
আকাশ তার হাতটা ধরে হাসল। সেই হাসিতে আর কোনো বিরক্তি ছিল না, ছিল কেবল আস্থা এবং ভালোবাসা। তার বলিষ্ঠ হাতের স্পর্শে অরুণিমার মনে হলো, সে যেন এক মুহূর্তের জন্য ইতিহাসের সমস্ত দুশ্চিন্তা ভুলে গেল।
“আপনার হাতের স্পর্শ পাওয়ার পর মনে হলো, আমার এতদিনের বাস্তববাদী জীবনে একটু স্বপ্নও থাকা দরকার। আর সেই স্বপ্নটা আপনি,” আকাশ নরম স্বরে বলল। “আমি স্থাপত্য নিয়ে কাজ করি। কিন্তু আপনার মতো করে কোনোদিনই কোনো ডিজাইন এত সুন্দরভাবে আঁকতে পারতাম না।”
অরুণিমা আকাশের কাঁধে মাথা রাখল। তাদের বৈপরীত্যের ওপর ভর করেই প্রেমের এক মজবুত সেতু তৈরি হলো। তারা অনুভব করল, তাদের জীবন এখন দুটি ভিন্ন নদী নয়, বরং একই মোহনায় মেশা দুটি জলধারা।
জীবনের প্রথম কঠিন নক্শা
অরুণিমা ও আকাশের প্রেম এখন গভীর। তাদের সম্পর্ক ছিল মিষ্টি, শান্ত এবং একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তারা একে অপরের বিপরীত হলেও, এখন যেন তারা এক অপরের পরিপূরক। পুরোনো শহরের প্রতিটি কোণ, প্রতিটি ক্যাফে এবং নীরব ট্রাম লাইন তাদের ভালোবাসার সাক্ষী।
কিন্তু জীবনের পথ সবসময় সরল রেখায় চলে না, যেমন স্থপতিরা সরল নক্শা আঁকতে চাইলেও প্রকৃতিতে তা সব সময় মেলে না। তাদের ভালোবাসার নক্শাতেও প্রথম জটিলতা এলো।
একদিন সন্ধ্যায় আকাশ অরুণিমাকে নিয়ে এক নির্জন পার্কে বসেছিল। আকাশকে দেখে মনে হচ্ছিল সে কিছু একটা বলতে চাইছে, কিন্তু কথাগুলো যেন গলায় আটকে আছে। তার চোখে ছিল এক মিশ্র অনুভূতি—আনন্দ এবং বিষণ্ণতা।
অবশেষে আকাশ খামটা অরুণিমার হাতে তুলে দিল। সেটা খুলে অরুণিমা দেখল, একটি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আর্কিটেকচার ফার্মের অফার লেটার।
“অরুণিমা, আমি একটা দারুণ সুযোগ পেয়েছি। লন্ডনের এক বিখ্যাত ফার্মে কাজ করার সুযোগ। প্রজেক্টটা তিন বছরের, সম্ভবত বেশিও হতে পারে।”
অরুণিমার মুখটা এক লহমায় ফ্যাকাসে হয়ে গেল। এই খবরটা একদিকে যেমন আকাশের জন্য আনন্দের, অন্যদিকে তেমনি তাদের জন্য বিচ্ছেদের বার্তা বহন করছিল। তিন বছর! তাদের সম্পর্কের এই সদ্য শুরু হওয়া দিনগুলোতে এত বড় দূরত্ব তাদের জন্য ছিল এক কঠিন পরীক্ষা।
অরুণিমা নিজেকে সামলে নিল। সে আকাশের হাত ধরে বলল, “এটা তো অসাধারণ সুযোগ, আকাশ! তোমার স্বপ্ন… তুমি যেতেই হবে।” কিন্তু তার গলার স্বরে ছিল এক অব্যক্ত যন্ত্রণা, যা আকাশ সহজেই ধরে ফেলল।
আকাশ অরুণিমাকে কাছে টেনে নিল। “আমি জানি, এটা কঠিন। কিন্তু অরুণিমা, আমি তো তোমাকেও নিয়ে যেতে চাইছিলাম। তবে তোমার পিএইচডি এবং তোমার এই দেশের ইতিহাসের প্রতি ভালোবাসা… সেটা কি লন্ডনে গিয়ে সম্পূর্ণ হবে? তুমি তো তোমার দেশের ইতিহাস নিয়েই কাজ করতে চাও।”
শুরু হলো তাদের মধ্যে এক চাপা দ্বন্দ্ব। তারা দু’জনেই একে অপরের স্বপ্নকে শ্রদ্ধা করে, কিন্তু সেই স্বপ্নগুলোই আজ তাদের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আকাশের কাছে: এই সুযোগ হাতছাড়া করা বাস্তব নয়, এটা তার কর্মজীবনের শ্রেষ্ঠ সোপান।
অরুণিমার কাছে: তার পিএইচডি এবং তার শিকড় ছেড়ে যাওয়া সম্ভব নয়, আর ভালোবাসার জন্য অন্যের স্বপ্নকে ভেঙে দেওয়াও অসম্ভব।
অরুণিমা দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “আমি এখন যেতে পারব না, আকাশ। আমার পিএইচডি শুরু হবে, আর সেটা এই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়েই করতে চাই। আমার শিকড় এই মাটি, এই ইতিহাস। আর আমি চাই না, আমার জন্য তোমার এত বড় স্বপ্ন ভেঙে যাক।”
আকাশের মন খারাপ হলো। সে কোনোদিনই অরুণিমাকে জোর করতে পারল না। সে বুঝল, অরুণিমার ভালোবাসা তার স্বপ্নের প্রতি যেমন, তেমনই তার দেশের প্রতিও অবিচল।
সিদ্ধান্ত হলো, আকাশ যাবে। দূরত্বের বাঁধনেও তারা সম্পর্কটা ধরে রাখবে। কিন্তু তার যাওয়ার ঠিক কিছুদিন আগে, দ্বিতীয় একটি কঠিন নক্শা তাদের জীবনে আঁকা হলো—পারিবারিক চাপ।
অরুণিমার পরিবার জানত না, তার জীবনে আকাশ বলে কেউ একজন আছে, যে এখন হাজার মাইল দূরে যাওয়ার অপেক্ষায়। তারা অরুণিমার জন্য একটি ভালো সম্বন্ধ নিয়ে এলো। সমাজের চোখে সেই ছেলেটি ছিল নিরাপদ এবং বাস্তববাদী। তার পরিবার চাইছিল, অরুণিমা যেন আর দেরি না করে এই সম্পর্ক নিয়ে ভাবে।
অরুণিমা সরাসরি পরিবারকে না করতে পারল না। তার মুখে ছিল দ্বিধা আর মনে ছিল ভয়।
আকাশের কানে এই খবর পৌঁছাল। তার মনটা ভেঙে গেল। সে শেষবারের মতো অরুণিমাকে ভিডিও কলে দেখল। “তাহলে কি আমাদের এই হঠাৎ দেখা, হঠাৎ ভালোবাসার গল্পটা এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে, অরুণিমা? আমার সমস্ত বাস্তববাদী পরিকল্পনা ব্যর্থ হলো তোমার স্বপ্নের কাছে?”
অরুণিমা কাঁপা গলায় জবাব দিল, “আমি জানি না, আকাশ। তবে একটা কথা জানি, আমাদের গল্পটা কখনোই হঠাৎ করে শেষ হতে পারে না। দূরত্ব এবং সমাজের চাপ—দুটোই কঠিন নক্শা। কিন্তু তুমি ভরসা রাখো। আমি কথা দিলাম, আমি চেষ্টা করব।”
আকাশের হৃদয় বিদীর্ণ হলো, কিন্তু অরুণিমার চোখে সে দেখল এক দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। সে জানত, তাদের ভালোবাসা এখন দূরত্বের পরীক্ষায়।
ফিরে আসার ডাক ও চিরন্তন পুনর্মিলন
আকাশ চলে গেল লন্ডন। দূরত্ব তৈরি করল এক বিশাল শূন্যতা। তাদের সম্পর্ক টিকে রইল কেবল ভিডিও কল আর মেসেজে। লন্ডন আর কলকাতা—প্রায় ৫,০০০ মাইলের ব্যবধান। সময়সূচিরও ছিল বড় পার্থক্য। যখন লন্ডনে মধ্যরাত গড়িয়ে কাজের শুরু, তখন কলকাতায় গভীর রাত। তবু তারা নিজেদের জন্য সময় বের করত। অরুণিমা তার পিএইচডি নিয়ে ব্যস্ত, আর আকাশ তার কাজে।
দূরত্ব তাদের প্রেমকে আরও অগভীর না করে বরং গভীর করল। আকাশ দেখল, লন্ডনের চোখ ধাঁধানো সাফল্য তাকে শান্তি দিচ্ছে না। তার প্রতিটি স্থাপত্যের নক্শায় যেন অরুণিমার হাসির অভাব, কলকাতার পুরোনো ট্রাম লাইনের একাকীত্বের সুর। সে বুঝল, বাস্তব জীবনের সমস্ত সাফল্যের থেকেও অরুণিমার উপস্থিতি তার কাছে কত মূল্যবান।
অরুণিমাও তার কাজে মন দিলেও, আকাশের শূন্যতা তাকে পীড়া দিত। সে বুঝল, আকাশের বাস্তববাদী চিন্তাভাবনার আড়ালে লুকিয়ে আছে তার প্রতি এক অবিচল ভালোবাসা এবং বিশ্বাস। তাদের প্রথম দেখা, কফিশপে তাদের দ্বিতীয় সাক্ষাৎ—সবকিছু যেন বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠত।
তবে অরুণিমার পরিবারের চাপ বাড়তে থাকল। পাত্রপক্ষ খুবই ভালো, আর তারা আর দেরি করতে রাজি নয়। অরুণিমাকে জানানো হলো, আগামী রবিবার পাত্রের পরিবারের সাথে চূড়ান্ত আলোচনার জন্য যেতে হবে। এই সিদ্ধান্ত তার মনের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করল।
অরুণিমা শেষ বারের মতো আকাশের সাথে ভিডিও কলে কথা বলল। তখন লন্ডনে ভোর, আকাশ সদ্য কাজ থেকে ফিরেছে।
অরুণিমা কাঁপা গলায় বলল, “আকাশ, আমার হাতে সময় নেই। রবিবার… আমাকে তাদের সঙ্গে দেখা করতে যেতে হবে। হয় তুমি কিছু একটা করো, না হলে আমাদের এই হঠাৎ দেখা গল্পটা কেবলই পুরোনো ডায়েরিতে লেখা থেকে যাবে।” তার চোখে জল, কিন্তু কণ্ঠে এক দৃঢ় মিনতি।
আকাশের মন ভেঙে গেল। সে বুঝতে পারল, এইবার আর বাস্তববাদী হলে চলবে না। তার কাছে পৃথিবীর সবথেকে সুন্দর নক্শা হলো অরুণিমার সাথে তার জীবন। এইবার তাকে তার ভালোবাসার জন্য স্বপ্ন দেখতে হবে, এবং সেই স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করতে হবে।
পরের দিন সকালে। অরুণিমা তার পরিবারের সাথে পাত্রপক্ষের বাড়িতে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে। তার মন অসম্ভব খারাপ। সে জানে, আজকের দিনটি তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে। সে একবুক কষ্ট নিয়ে গাড়িতে ওঠার জন্য বাড়ির দরজার দিকে এগোচ্ছিল।
হঠাৎ দরজায় কলিং বেল বেজে উঠল।
অরুণিমা দ্বিধা নিয়ে দরজা খুলল। আর দরজার সামনে যাকে দেখল, তাকে দেখে তার হৃদপিণ্ড যেন এক লহমায় থেমে গেল। দরজার সামনে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে—ভিজে জামাকাপড়, চোখে ক্লান্তির ছাপ, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, কিন্তু ঠোঁটে সেই পরিচিত মায়াময় হাসি।
আকাশ!
“আকাশ! তুমি? তুমি কখন এলে?” অরুণিমা চমকে গেল, তার চোখে আনন্দের বন্যা।
“সকাল ন’টার প্লেন ধরে, ইতিহাসের ছাত্রী,” আকাশ হাসল। “আমি স্থপতি। আমি কেবল পুরোনো বিল্ডিং তৈরি করি না। পুরোনো সম্পর্ককেও নতুন করে নক্শা করতে জানি। আমার জীবনের নক্শায় কোনো ফাঁকা স্থান থাকতে পারে না। তাই ফিরে এলাম।”
আকাশ এক মুহূর্ত নষ্ট না করে সোজা অরুণিমার বাবার কাছে গেল। তার হাতে ছিল পুরোনো একটি বই—সেই ফরাসি বিপ্লবের বই, যা অরুণিমা কলেজ স্ট্রিটে ফেলে দিয়েছিল।
আকাশ সহজ কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল, “আমি জানি, আমি এত দিন লন্ডনে ছিলাম। কিন্তু আমি আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টটা অসমাপ্ত রেখে যেতে চাই না। আমার জীবনের নক্শা অরুণিমাকে দিয়েই সম্পূর্ণ হবে। আমি জানি, আমি আপনার মেয়ের জন্য হয়তো যথেষ্ট সম্পদশালী নই, কিন্তু আমি আপনার মেয়েকে আমার জীবনের থেকেও বেশি ভালোবাসি এবং সম্মান করি।”
অরুণিমার বাবা আকাশের চোখে দেখল অকৃত্রিম ভালোবাসা ও সম্মান। তার বাস্তববাদী কিন্তু সাহসী পদক্ষেপ, এবং স্বপ্নের চেয়ে ভালোবাসাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার মানসিকতা অরুণিমার পরিবারকে মুগ্ধ করল। তারা বুঝতে পারল, এই ছেলেটি কেবল কথা বলে না, সে কাজ করেও দেখায়।
আকাশ জানাল, সে লন্ডনের কাজটি ছেড়ে দেয়নি, বরং নিজের ফার্মের সাথে চুক্তি করেছে, সে এখন থেকে কলকাতার কিছু ঐতিহ্যবাহী প্রজেক্টের কাজ দেখবে এবং বাকি কাজ দূর থেকে পরিচালনা করবে। তার কাছে ভালোবাসাটাই আসল স্থায়িত্ব।
দুই পরিবার একসাথে বসে কথা বলল। সব ভুল বোঝাবুঝি দূর হলো। এক বছর পর, ট্রাম লাইনের ঠিক পাশে, ‘কবিতা ক্যাফে’-র কাছাকাছি এক সুন্দর পুরোনো বাড়িতে তাদের বিয়ে হলো। তাদের বিয়ের কার্ডে লেখা ছিল, “আমাদের জীবন দুটি ভিন্ন নদী, যা এক হঠাৎ দেখায় মিশে গেছে এক অসীম সাগরে।”
বিয়ের পর এক বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায়, তারা দু’জন বারান্দায় বসে কফি খাচ্ছিল। আকাশ এখন বৃষ্টিতে ভেজে না, কিন্তু বৃষ্টি উপভোগ করতে ভালোবাসে।
অরুণিমা আকাশের কাঁধে মাথা রেখে হাসতে হাসতে বলল, “এখনও বৃষ্টিতে ভিজতে ভালো লাগে না?”
আকাশ অরুণিমাকে কাছে টেনে নিয়ে কফির কাপে চুমুক দিল। “বৃষ্টিতে ভেজাটা এখনও অপছন্দ, অরুণিমা। তবে তোমার সাথে একসাথে এই কফি কাপের উষ্ণতা ভাগ করে নেওয়াটা এখন আমার কাছে সবথেকে বড় বাস্তবতা।”
তাদের ‘হঠাৎ দেখা’-র গল্পটা এভাবেই শেষ হলো এক মিষ্টি, চিরন্তন পুনর্মিলনে।
