দ্বন্দ্বরেখা
সোনালী অতীত
কলেজের শেষ সেমিস্টারের রাত ছিল সেটা। আর্কিটেকচার ব্লকের ছাদে বসে ছিল অরুণিমা আর শায়ান। কলকাতা তখনো জাগেনি, কিন্তু তাদের চোখে ছিল আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন। সামনে ছড়ানো ছিল চার্লি ল্যান্ডিং স্টাডি মেটেরিয়ালস আর কফির কাপ। দমকা হাওয়ায় অরুণিমার চুল উড়ছিল, আর সেই চুলে আলতো হাত রেখে শায়ান বলেছিল, “দেখিস অরুণি, একদিন আমরা দু’জন মিলে দেশের সেরা ফার্ম খুলব। তুই হবি আইডিয়া কুইন, আর আমি তোর নকশার কাঠামো গড়ব।”
অরুণিমা হেসে শায়ানের কাঁধে মাথা রেখেছিল। “শুধু কাঠামো নয় শায়ান, তুই হবি আমার ঢাল। বাইরের সব চাপ সামলে শুধু আমাকে ডিজাইন করতে দিবি। প্রমিস?”
“প্রমিস,” শায়ান বলেছিল, “এইটা আমাদের ভালোবাসার সবচেয়ে বড় ব্লুপ্রিন্ট।” সেই রাতে আকাশটা ছিল অসংখ্য তারায় ভরা, আর তাদের ভবিষ্যতের নকশাটি ছিল ঠিক ততটাই উজ্জ্বল আর নিখুঁত। প্রেম আর পেশা, দুটি রেখা সেখানে মিলেমিশে একাকার হয়েছিল।
বর্তমানের কঠিন বাস্তবতা
পাঁচ বছর কেটে গেছে। সেই প্রেম আর স্বপ্নের সরলরৈখিক পথ এখন বাঁক খেয়েছে, তৈরি হয়েছে এক অদৃশ্য ‘দ্বন্দ্বরেখা’। অরুণিমা এখন শহরের অন্যতম পুরনো এবং সম্ভ্রান্ত ফার্ম ‘সেন অ্যান্ড সন্স’-এর অ্যাসোসিয়েট আর্কিটেক্ট। আর শায়ান কাজ করে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ‘এপিয়াস ডিজাইন স্টুডিও’তে।
আজ অফিসে ছিল অরুণিমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন। তার জীবনের বহু আকাঙ্ক্ষিত প্রজেক্ট—‘গঙ্গা টাওয়ার’—এর ডিজাইন প্রস্তাবনা তার বসের কাছে জমা দেওয়ার দিন। এটা শুধু একটা প্রজেক্ট নয়, এটা অরুণিমার পেশাদারী সাফল্যের চাবিকাঠি। তার নকশাটা ছিল ঐতিহ্যবাহী বঙ্গীয় স্থাপত্য এবং আধুনিক, টেকসই ডিজাইনের এক সাহসী মিশ্রণ।
মি. সেন (বস) ফাইলটা হাতে নিয়ে গম্ভীর মুখে বললেন, “নকশা ভালো, অরুণিমা। কিন্তু প্রতিযোগিতা কঠিন। ক্লায়েন্টরা এবার নতুন কিছু চাইছে। আর আমাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ‘এপিয়াস’-এর প্রস্তাবনাটিও দেখতে হবে।”
অরুণিমার বুক কেঁপে উঠল। ‘এপিয়াস’। সে জানত, এই ফার্মে শায়ান কাজ করে। তবে সে এই প্রজেক্টের লিড হবে, এমনটা ভাবতে পারেনি।
প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রথম ধাক্কা
বিকেলে মিটিং রুমের কাঁচের দেওয়ালের ওপারে অরুণিমা তাকে দেখতে পেল। লম্বা, সুদর্শন, সেই একই আত্মবিশ্বাসী হাসি—শায়ান। সে সুট-টাই পরা অবস্থায় ক্লায়েন্টদের সাথে কথা বলছিল। হাতে তার সেই একই নকশার রোল, যা অরুণিমা বহু বছর আগে তার আঁকা স্কেচবুকে দেখেছিল।
অরুণিমার হাত থেকে কফির কাপটা প্রায় পড়েই যাচ্ছিল। শায়ান লিড আর্কিটেক্ট!
অরুণিমা জোর করে নিজেকে শান্ত করল। মিটিং শেষে শায়ান যখন হাসি মুখে এগিয়ে এলো, অরুণিমা তখন পুরোপুরি পেশাদারী মুখোশ পরে নিল।
“হাই অরুণিমা, ভাবিনি দেখা হবে। দারুণ কাকতাল,” শায়ান বলল, কণ্ঠস্বরে সেই মিষ্টি আন্তরিকতা।
“শুভেচ্ছা শায়ান। প্রজেক্টটা বড়, তাই বড় প্রতিযোগিতাই আশা করেছিলাম,” অরুণিমা ঠান্ডা স্বরে জবাব দিল। “তবে, আমার নকশা তোর নকশার চেয়ে এক ইঞ্চি হলেও এগিয়ে থাকবে, প্রমিস।”

শায়ানের হাসিটা এক লহমায় মিলিয়ে গেল। “অরুণি, এটা একটা প্রজেক্ট। এর মাঝে…”
অরুণিমা তাকে থামিয়ে দিল, “না শায়ান, এটা শুধুই প্রজেক্ট নয়। এটা আমার স্বপ্ন। এখানে কোনো ছাড় নেই।”
শায়ান কিছুক্ষণ অরুণিমার জেদী চোখের দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। “ঠিক আছে। তবে যেন জিতেই দেখাস। আমি দেখতে চাই, পাঁচ বছরে তুই কতটা বদলেছিস।”
সম্পর্কের মধ্যে শীতলতা
সে রাতে পার্ক স্ট্রিটের একটা ক্যাফেতে তারা দেখা করল, যা ছিল তাদের প্রিয় স্থান। জায়গাটা ছিল নিস্তব্ধ, কিন্তু তাদের কথোপকথন ছিল শীতল।
“তুই কি প্রজেক্টটাকে ব্যক্তিগতভাবে নিচ্ছিস, অরুণি?” শায়ান সরাসরি জানতে চাইল।
অরুণিমা রেগে গেল। “ব্যক্তিগত নয়? এই প্রজেক্টটা আমার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট। আর তুই জানিস, আমার কাছে খ্যাতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ।” সে টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ল, “তুই কেন এই প্রজেক্টটা নিলি, শায়ান? অন্য হাজারটা প্রজেক্ট ছিল।”
শায়ান শান্তভাবে কফি শেষ করল। “কারণ এটা আমারও স্বপ্ন অরুণিমা। তোর উচ্চাকাঙ্ক্ষা কি আমার উচ্চাকাঙ্ক্ষার চেয়ে বেশি? আমরা দুজনেই সেরা হতে চেয়েছিলাম, মনে নেই?”
অরুণিমা হতাশ হয়ে মাথা নাড়ল। সে বুঝতে পারছিল, তাদের ভালোবাসার সেই সরল ‘ব্লুপ্রিন্ট’ ভেঙে গেছে। সামনে এখন শুধুমাত্র একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতার ময়দান।
“ঠিক আছে, তাহলে এটাই হোক,” অরুণিমা ফিসফিস করে বলল। “আমরা এবার দেখব, আমাদের ভালোবাসা না কি আমাদের কেরিয়ার, কার ভিত্তি মজবুত।”
শায়ান উত্তর দিল না। সে শুধু দেখল, তাদের সম্পর্কের রেখাটি পেশাদারী প্রতিদ্বন্দ্বিতার রেখার সাথে মিশে গিয়ে একটি কঠিন দ্বন্দ্বরেখা তৈরি করেছে, যা পার হওয়া তাদের দুজনের জন্যই কঠিন হতে চলেছে।
গোপন বৈঠক ও সন্দেহ
প্রথম ধাপের প্রেজেন্টেশনের পর ক্লায়েন্টদের প্রতিক্রিয়া ছিল মিশ্র। অরুণিমার নকশা ছিল সাহসী, কিন্তু শায়ানের নকশা ছিল বাস্তবায়ন এবং বাজেট-সচেতনতার দিক থেকে কিছুটা এগিয়ে। তবে, সবচেয়ে বড় চমক ছিল অন্যখানে—তাদের দুজনের নকশার মূলে থাকা থিমটি ছিল একই: “নদীমাতৃক ঐতিহ্যের আধুনিক পুনর্জন্ম”।
মিটিং শেষে ক্লায়েন্টদের একজন, মি. চ্যাটার্জি, হাসি মুখে অরুণিমাকে বললেন, “খুবই ইন্টারেস্টিং! মনে হচ্ছে, আর্কিটেকচার জগতে নতুন কোনো ট্রেন্ড আসছে। নয়তো দু’জন প্রতিদ্বন্দ্বী এত কাছাকাছি আইডিয়া নিয়ে কাজ করতে পারে না!”
কথাবার্তাগুলো অরুণিমার কাছে তীর হয়ে বিঁধল। সে জানত, এই ধারণাটি শায়ান আর তার কলেজ জীবনের এক যৌথ স্বপ্ন ছিল। কিন্তু এখন, পেশাদারী জগতে এর মিল খুঁজে পাওয়াটা ছিল বিপজ্জনক। সে তার অফিসের অন্যান্য আর্কিটেক্টদের চোখে স্পষ্ট সন্দেহ দেখতে পেল। তারা কানাঘুষা করছে, “অরুণিমা কি তথ্য ফাঁস করছে? নাকি শায়ান জেনেশুনে পুরনো আইডিয়া চুরি করেছে?”
অবিশ্বাসের শীতল স্পর্শ
রাতে অরুণিমা শায়ানকে ফোন করল। কণ্ঠস্বর ছিল কঠিন, আবেগহীন।
“শায়ান, তুই কি আমার আইডিয়া চুরি করেছিস?”
শায়ান অবাক হল না, কিন্তু আহত হল। “এটা কী বলছিস অরুণি? তুই কি ভুলে গেছিস, ওই ‘নদীমাতৃক ঐতিহ্য’ থিমটা আমাদের দুজনেরই স্বপ্ন ছিল? আমরা একসাথে কত রাত জেগে এই নিয়ে আলোচনা করেছি! ওটা তো আমাদের যৌথ সৃষ্টি।”
“সৃষ্টি হয়তো ছিল,” অরুণিমা পাল্টা জবাব দিল, “কিন্তু এখন আমরা প্রতিদ্বন্দ্বী। পেশাদারী জগতে ‘যৌথ সৃষ্টি’ বলে কিছু হয় না। হয় আমার কাজ, নয়তো তোর কাজ। আমার মনে হচ্ছে, তুই সচেতনভাবে আমার চিন্তাভাবনার ওপর নজর রাখছিস।”
শায়ান ফোনটা ধরে নিঃশ্বাস ফেলল। “তুই আমাকে বিশ্বাস করিস না, তাই তো? তোর কাছে কি মনে হয়, আমি এত নীচে নামতে পারি?”
অরুণিমা চুপ করে রইল। তার নীরবতা শায়ানের কাছে জবাব ছিল। সম্পর্কের মধ্যে অবিশ্বাসের একটা শীতল, লম্বা দেওয়াল যেন উঠে গেল। শায়ান ফোনটা রেখে দিল। অরুণিমা অনুভব করল, সাফল্যের সিঁড়ি তৈরি করতে গিয়ে সে তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির সাথে যোগাযোগের সেতুটাই ভেঙে দিচ্ছে।
সহকর্মীর চোখে ধরা
পরের দিন বিকেলে অরুণিমা খুব ক্লান্ত থাকায় অফিসের নিচে একটি কফি শপে শায়ানের সাথে দেখা করল। তারা একে অপরের ডিজাইন বা প্রজেক্টের কথা বলেনি, কেবল নিজেদের শারীরিক ও মানসিক চাপ নিয়ে কথা বলছিল। তাদের সম্পর্ক নিয়ে নীরব যুদ্ধ চলছে, যা তারা বাইরে প্রকাশ করতে চায়নি।
কিন্তু নিয়তি অন্যরকম চেয়েছিল। তাদের অফিসের সহকর্মী, ঈশান—যে দীর্ঘদিন ধরে অরুণিমাকে গোপনে পছন্দ করত এবং শায়ানের প্রতি ঈর্ষান্বিত ছিল—তাদের একসঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতে দেখল।
মুহূর্তেই ঈশান ছবি তুলে নিল এবং পরদিন অফিসে রটিয়ে দিল যে অরুণিমা এবং শায়ান ‘গঙ্গা টাওয়ার’-এর প্রজেক্টের তথ্য আদান-প্রদান করছে। পুরো অফিসে গুজব ছড়িয়ে পড়ল, “তারা দুজনে প্রেমের নামে ফার্মের তথ্য বাইরে পাচার করছে।”
বসের কাছে কৈফিয়ত
গুজব দ্রুত মি. সেনের কানে পৌঁছাল। তিনি তৎক্ষণাৎ অরুণিমাকে ডেকে পাঠালেন। মি. সেনের চোখে ছিল হতাশা ও অবিশ্বাস।
“অরুণিমা, তোমাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক সম্পর্কে আমরা কিছু জানতে চাই না, কিন্তু প্রজেক্টের সততা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠা উচিত নয়। তোমার কাছে প্রমাণ চাই, তুমি কেন প্রতিদ্বন্দ্বী ফার্মের লিড আর্কিটেক্টের সাথে ঘন ঘন দেখা করছ?”
অরুণিমা অপমানিত বোধ করল। “স্যার, আমরা শুধু পরিচিত। পুরোনো বন্ধু…”
“বন্ধু? নাকি তার থেকেও বেশি কিছু?” মি. সেন অরুণিমাকে থামিয়ে দিলেন। “শায়ানকে ফোন করো। আমিও কথা বলতে চাই।”
শায়ান ফোন ধরতেই মি. সেন সরাসরি জানতে চাইলেন তাদের সম্পর্কের গভীরতা কতটুকু। শায়ান এক মুহূর্ত ভাবল। সে জানত, যদি সে সত্যটা স্বীকার করে, তাহলে অরুণিমার প্রজেক্টটি বাতিল হতে পারে এবং তার নিজের ক্যারিয়ারও ঝুঁকিতে পড়বে।
“আমরা শুধু পরিচিত, স্যার। দীর্ঘদিনের পরিচিতি। এই প্রজেক্ট নিয়ে আমাদের মধ্যে কোনো আলোচনা হয়নি। এটা সম্পূর্ণ পেশাদারী প্রতিযোগিতা,” শায়ান শান্ত, কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল।
শায়ানের কথা শুনে অরুণিমার কান গরম হয়ে উঠল। সে বুঝতে পারল, শায়ান তাকে বাঁচানোর জন্য ‘প্রেমিকা’ পরিচয়টা অস্বীকার করল, নিজেকে অরুণিমার কাছে ছোট করল। তার জন্য শায়ানের আত্মত্যাগ ছিল, কিন্তু অরুণিমার হৃদয়ে বাজল চরম আঘাত। শায়ান প্রকাশ্যে তাদের সম্পর্ককে ‘অস্বীকার’ করেছে।
অরুণিমা বুঝতে পারল, এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেবল নকশার নয়, তাদের বিশ্বাসের ভিত্তিকে পর্যন্ত নাড়িয়ে দিয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবনের বিপর্যয়
কয়েক সপ্তাহ ধরে ‘গঙ্গা টাওয়ার’-এর কাজ চলছে পূর্ণ উদ্যমে। অরুণিমা আর শায়ানের মধ্যে এখন যোগাযোগ বলতে শুধু অফিসিয়াল ইমেল বা ক্লায়েন্ট মিটিংয়ে শীতল দৃষ্টি বিনিময়।
আজ অরুণিমার জন্মদিন। কলেজ জীবনে এই দিনটি ছিল তাদের কাছে এক উৎসব। শায়ান সবসময় এই দিনটার জন্য বিশেষ কিছু পরিকল্পনা করত। অরুণিমা আশা করেছিল, শায়ান হয়তো অতীতের কথা মনে রেখে অন্তত একটা ফোন করবে, অথবা গত রাতে দেখা করতে চাইবে।
অফিসের কাজ শেষ করে যখন সে ফ্ল্যাটে ফিরল, তখন অন্ধকার ঘরে একরাশ শূন্যতা। রাত প্রায় ন’টা। শায়ানের কাছ থেকে কোনো ফোন নেই, এমনকি একটা টেক্সটও নেই। উচ্চাকাঙ্ক্ষী হওয়ার মূল্য সে দিচ্ছে, কিন্তু এই নিঃসঙ্গতা ছিল অসহনীয়।

রাত সাড়ে দশটায় ফোনটা বাজল। শায়ান। “অরুণি, আমি দুঃখিত। আজ সারাদিন একটা প্রজেক্টের ডেলিভারি ডেডলাইন ছিল। আমি সত্যি ভুলে গেছিলাম… মানে, খেয়াল ছিল না যে এতটা সময় লাগবে।” তার কণ্ঠে স্পষ্ট ক্লান্তি ও অপরাধবোধ।
অরুণিমা নিজেকে শান্ত রাখল। “ঠিক আছে শায়ান। কাজ আগে। তুই তোর খ্যাতি নিয়ে থাক।” ফোনটা কেটে দিয়ে সে দ্রুত রান্নাঘরে চলে গেল, যাতে শায়ান তার গলার ভেতরের কান্নাটা শুনতে না পায়। সম্পর্কের বাঁধন আলগা হতে হতে প্রায় ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম।
পরের দিন, অরুণিমা কিছু প্রতিযোগিতামূলক তথ্য জানতে শায়ানের জমা দেওয়া নকশার ডিজিটাল কপি খুঁটিয়ে দেখছিল। ফাইলটি খোলার সময় একটি পুরনো ফোল্ডারের নাম তার চোখে পড়ল—’Dream Designs – A+S’। এটা তাদের কলেজ জীবনের ল্যাপটপে থাকা একটি ফোল্ডার ছিল, যেখানে তারা দুজনে তাদের ভবিষ্যতের সব নকশা জমিয়ে রাখত।
অরুণিমা দ্রুত শায়ানের দেওয়া নকশার ভেতরের কাঠামোটি বিশ্লেষণ করতে শুরু করল। ভেতরের কাঠামোটি দেখতে গিয়ে সে চমকে উঠল। শায়ান তার নকশার একটি মূল উপাদান—টাওয়ারের কেন্দ্রস্থলে জল সংরক্ষণ এবং পুনর্ব্যবহারের জন্য একটি সবুজ ‘ক্যানোপি’ তৈরি করার ধারণা—ব্যবহার করেছে। এই ধারণাটি তাদের বহু বছর আগের এক বৃষ্টির দিনে আঁকা একটি স্কেচ থেকে নেওয়া, যা শুধুমাত্র সেই ‘A+S’ ফোল্ডারেই ছিল।
অরুণিমার হাত কাঁপতে শুরু করল। এটা কি নিছক মিল? নাকি শায়ান জেনেশুনে সেই ফোল্ডার থেকে এই আইডিয়া চুরি করেছে?
চরম বিস্ফোরণ
অরুণিমা সরাসরি শায়ানের অফিসে গেল। মিটিং শেষে শায়ান যখন বাইরে বেরিয়ে এলো, অরুণিমা তাকে সোজাসুজি প্রশ্ন করল।
“তুই কেন আমাদের সেই পুরোনো ‘ক্যানোপি’ আইডিয়াটা ব্যবহার করলি? তুই ভুলে গেছিলি, না কি ইচ্ছে করে চুরি করেছিস?” অরুণিমার চোখ দিয়ে আগুন ঝরছিল।
শায়ান অবাক হয়ে গেল। “চুরি? অরুণিমা, এইটা আমাদের দু’জনের আইডিয়া ছিল! তুই তো তোর নকশায় ওটা ব্যবহার করিসনি। আমি ভেবেছিলাম, এটা একটা চমৎকার ধারণা, নষ্ট হতে দেওয়া উচিত নয়।”
“নষ্ট?” অরুণিমা চিৎকার করে উঠল। “তুই কি মনে করিস, খ্যাতি অর্জনের জন্য আমি অন্য কারো আইডিয়া চুরি করব? তুই আমার নকশা থেকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের স্মৃতি চুরি করেছিস! তুই আমাকে বিশ্বাস করতে পারিসনি, তাই সেদিন ফোন করে আমাদের সম্পর্ককে অস্বীকার করেছিস। এখন আমার আইডিয়া নিয়ে নিজের কাজকে শক্তিশালী করছিস!”
শায়ানের মুখেও বিরক্তির ছাপ দেখা গেল। “অরুণিমা, তুই নিজেকে অন্ধ করে ফেলেছিস! আমি প্রজেক্টের জন্য ব্যক্তিগত সম্পর্ক অস্বীকার করেছি যাতে তোর কোনো ক্ষতি না হয়! আর এখন তুই আমাকে চোর বলছিস?”
“আমি চোর বলছি না! আমি বলছি, তোর কাছে তোর খ্যাতি আর সাফল্য আমার ভালোবাসার চেয়ে অনেক বড়। তোর জীবনে আমি শুধু একটা বাধা, একটা পুরোনো স্কেচবুক মাত্র!”
শায়ান বুঝতে পারল, এই মুহূর্তে অরুণিমাকে বোঝানো সম্ভব নয়। তার জেদ, রাগ আর উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাদের সম্পর্কের স্বাভাবিকতাকে গ্রাস করে ফেলেছে।
“ঠিক আছে অরুণিমা,” শায়ান ক্লান্ত স্বরে বলল। “যদি তোর তাই মনে হয়, তাহলে তাই হবে। আমাদের পথ এখন আলাদা। আমাদের সম্পর্কটা আজ শেষ হলো। কারণ, আমি তোর কাছে তোর স্বপ্নের পথে একটা কাঁটা হতে চাই না।”
অরুণিমা এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। এই চরম পরিণতি সে আশা করেনি, কিন্তু তার জেদ তাকে পিছিয়ে আসতে দিল না। সে কোনো কথা না বলে, চোখের জল সামলে দ্রুত সেখান থেকে বেরিয়ে এলো।
চূড়ান্ত লড়াইয়ের ঘোষণা
সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পর অরুণিমা যেন নতুন করে জেদ খুঁজে পেল। তার কাছে এখন আর হারানোর কিছু নেই, শুধু প্রমাণ করার বাকি যে, সে একাই সেরা। এই প্রজেক্ট জেতা এখন তার কাছে শুধু পেশাগত সাফল্য নয়, বরং শায়ানের প্রতি তার নীরব ক্ষোভের জবাব।
এদিকে শায়ানও চুপ করে থাকল না। হৃদয়ে কষ্ট থাকলেও, পেশাগতভাবে সে পিছু হটতে নারাজ। সে জানে, অরুণিমা হয়তো তাকে ভুল বুঝছে, কিন্তু কাজের মাঠে আবেগ দেখানো উচিত নয়।
চূড়ান্ত প্রতিযোগিতার তারিখ ঘোষণা হলো। দুজনই নিজেদের সবটুকু উজাড় করে দিল, কিন্তু ভেতরে ভেতরে দুজনেই ভেঙে পড়েছিল। তারা ভুলে গেল যে তারা ভালোবাসার জন্য লড়ছে, নাকি ভালোবাসার মানুষকে হারানোর জন্য।
ক্লায়েন্টের সিদ্ধান্ত ও উপলব্ধি
শহরের অন্যতম বিলাসবহুল হোটেলের বোর্ডরুমে শুরু হলো চূড়ান্ত প্রেজেন্টেশন। অরুণিমা এবং শায়ান, দুজনেই তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ নিয়ে ক্লায়েন্টদের সামনে উপস্থিত। ঘরভর্তি ক্লায়েন্টের প্রতিনিধিরা, মি. সেন এবং শায়ানের বস উপস্থিত। দু’জনের হৃদয়ের গতি তখন রেসিং ট্র্যাকের মতো দ্রুত। অরুণিমা জানে, এই প্রজেক্ট হারালে তার জেদের আগুন হয়তো নিভে যাবে, কিন্তু সম্পর্কটা তো আগেই শেষ। শায়ান ছিল পাথরের মতো স্থির, কিন্তু তার চোখে ছিল এক গভীর বিষণ্ণতা।
প্রথমে শায়ান তার নকশা উপস্থাপন করল। তার ‘এপিয়াস’ টিমের নকশা ছিল কার্যকারিতা, বাজেট এবং আধুনিক প্রযুক্তির দিক থেকে প্রায় ত্রুটিহীন। সবাই মুগ্ধ হলো, এমনকি মি. সেনও মাথা নাড়লেন।
এরপর পালা এলো অরুণিমার। তার নকশা ছিল শৈল্পিক, আবেগপূর্ণ এবং পরিবেশবান্ধব। সে তার নকশার প্রতিটি কোণে তার ভালোবাসা আর স্বপ্নের ছোঁয়া দিয়েছিল। উপস্থাপনের শেষে ক্লায়েন্টদের দিক থেকে নীরবতা নেমে এলো।
নকশার ত্রুটি
কিছুক্ষণ পর ক্লায়েন্ট টিমের প্রধান, মি. ভার্মা, ধীরে ধীরে বললেন, “অরুণিমা, আপনার ‘সেন অ্যান্ড সন্স’-এর নকশাটি সত্যিই আবেগপূর্ণ। কিন্তু একটা বড় সমস্যা রয়ে যাচ্ছে। আপনার প্রস্তাবিত কাঁচ এবং স্টিলের ব্যবহার টাওয়ারটিকে অত্যন্ত ভারি করে তুলেছে, যা এই অঞ্চলের ভূমিকম্প প্রতিরোধী নির্মাণ (Seismic Stability) নীতির সঙ্গে পুরোপুরি মানানসই হবে না। এর ফলে রক্ষণাবেক্ষণ খরচও মারাত্মক বাড়বে। আপনি এত সুন্দর ডিজাইন করেছেন, কিন্তু এই একটা বড় টেকনিক্যাল ত্রুটি—যা কি না একটা কাঠামোগত দুর্বলতা—আপনার কাজকে পিছিয়ে দিচ্ছে।”

অরুণিমার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। এটা এমন একটা টেকনিক্যাল দিক, যা তার উচ্চাকাঙ্ক্ষার ভিড়ে চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল। সে উত্তর দিতে গিয়েও পারল না। তার স্বপ্নগুলো যেন চোখের সামনে ভেঙে যাচ্ছিল। এই পরাজয় শুধু পেশাগত নয়, যেন তার জেদ আর অহংকারের পরাজয়।
শায়ানের নিঃশর্ত আত্মত্যাগ
মি. ভার্মার প্রশ্নের পর যখন অরুণিমা প্রায় হার মেনে নিয়েছে, তখন অপ্রত্যাশিতভাবে শায়ান উঠে দাঁড়াল। তার চোখে তখন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল না, ছিল শুধু স্থির আন্তরিকতা।
“মি. ভার্মা, আমি আপনার কথায় একমত,” শায়ান শান্ত কণ্ঠে বলল। “নকশাটিতে ভার বেশি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তবে এই সমস্যা সমাধানের একটি উপায় আছে।”
অরুণিমা অবাক হয়ে শায়ানের দিকে তাকাল। শায়ান তার নিজের নকশার দুর্বলতার কথা না বলে, অরুণিমার নকশার ত্রুটি পূরণের কথা বলছে!
শায়ান দ্রুত বোর্ডে একটি জটিল গাণিতিক বিন্যাস আঁকল এবং ব্যাখ্যা করল, “যদি ভারি স্টিলের বদলে ‘কম্পোজিট স্ট্রাকচার্ড ব্যালেন্সিং’ ব্যবহার করা হয়, যা কংক্রিট এবং নির্দিষ্ট ধরনের হাই-গ্রেড পলিমারের মিশ্রণ, তবে টাওয়ারের লোড প্রায় ১৫ শতাংশ কমানো সম্ভব। আমার টিম এই বিকল্প নিয়ে কাজ করেছে, এবং এই প্রযুক্তি ‘সেন অ্যান্ড সন্স’-এর নকশাকে স্থিতিশীল করতে পারে।”
পুরো বোর্ডরুমে নীরবতা। শায়ান সোজাসুজি অরুণিমাকে বিজয়ী করার জন্য নিজের নকশার সবচেয়ে শক্তিশালী বিকল্প সমাধানটি প্রকাশ করে দিল—যা ছিল তার জেতার প্রধান কৌশল।
ক্লায়েন্টের চূড়ান্ত রায়
কিছুক্ষণ আলোচনার পর মি. ভার্মা রায় ঘোষণা করলেন। তিনি অরুণিমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “মিস অরুণিমা, ‘গঙ্গা টাওয়ার’-এর প্রজেক্ট আপনার ফার্মকে দেওয়া হলো।”
অরুণিমা অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল। মি. ভার্মা হেসে যোগ করলেন, “এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার দুটি কারণ। এক, আপনার নকশার শৈল্পিক সৌন্দর্য ক্লায়েন্টদের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। আর দুই, আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী, মি. শায়ান, যখন আপনার নকশার দুর্বলতা দূর করার জন্য এমন গুরুত্বপূর্ণ সমাধান নিঃস্বার্থভাবে দিলেন—তখন আমরা বুঝতে পারলাম, আপনারা দু’জন আসলে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নন। আপনারা একে অপরের শক্তি। আমাদের ইচ্ছা, ভবিষ্যতের জন্য আপনারা দু’জনেই এই প্রজেক্টে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত থাকুন।”
অরুণিমা মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় জয়ী হওয়ার আনন্দ নয়, এক গভীর অনুশোচনা অনুভব করল। তার জয়টা এসেছে শায়ানের নিঃশর্ত ত্যাগের মাধ্যমে। তার খ্যাতি, তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সবকিছুই আজ শায়ানের কাছে মাথা নত করেছে। সে বুঝতে পারল, শায়ান তাকে ভালোবাসে বলেই তাদের সম্পর্ককে ‘অস্বীকার’ করেছিল, আর ভালোবাসে বলেই নিজের জেতার সুযোগটা বিসর্জন দিয়েছে।
এই উপলব্ধি অরুণিমাকে ভেঙে দিল। প্রেম সত্যিই সব প্রতিযোগিতার ঊর্ধ্বে, এবং সেই প্রেমই শায়ান বারবার প্রমাণ করে গেল।
পুনর্মিলন এবং নতুন পথ
অরুণিমা প্রজেক্ট জিতেও কোনো আনন্দ পেল না। ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে অভিনন্দন বার্তা বা বসের প্রশংসা—কোনোটাই তাকে স্পর্শ করল না। সে যেন একটি শূন্যতা অনুভব করছিল। তার জয় এসেছিল, কিন্তু তার আত্মা যেন পরাজিত।
মিটিং শেষ হওয়ার সাথে সাথেই সে শায়ানের খোঁজে বের হলো। শায়ান তখন তার ফার্মের লবিতে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল, বাইরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত।
অরুণিমা দ্রুত তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখে তখন জল, যা উচ্চাকাঙ্ক্ষার অহংকারকে ধুয়ে ফেলেছে। “শায়ান… আমি… আমি দুঃখিত,” অরুণিমা ফিসফিস করে বলল।
শায়ান হাসল, তবে সেই হাসিতে ছিল ক্লান্তি। “অভিনন্দন, অরুণি। তুই জিতেছিস। আমি জানতাম, তোর নকশাটা সেরা।”
“না, শায়ান। আমি জিতিনি,” অরুণিমা মাথা নাড়ল। “আমি শুধু তোর ত্যাগের বিনিময়ে এই জয় পেয়েছি। তুই কেন এমন করলি? তুই কেন নিজের জেতার সুযোগটা বিসর্জন দিলি?”
শায়ান অরুণিমার চোখে গভীর দৃষ্টিতে তাকাল। “কারণ, আমি সত্যিই তোকে হারানোটা সহ্য করতে পারতাম না, অরুণিমা। সেদিন যখন তোর বসকে বলেছিলাম আমরা শুধু পরিচিত, সেদিনও তোর প্রজেক্ট বাঁচাতে চেয়েছিলাম। আর আজ, যখন দেখলাম তোর স্বপ্নটা ভেঙে যাচ্ছে, আমি আমার খ্যাতি বা প্রজেক্টের চেয়ে তোর খুশিকে বেশি মূল্য দিলাম। আমি তোকে ভালোবাসি, অরুণি। আর ভালোবাসা কোনো প্রতিযোগিতার নাম নয়।”
অরুণিমা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে শায়ানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তাদের মাঝে থাকা সমস্ত ভুল বোঝাবুঝির ‘দ্বন্দ্বরেখা’ যেন মুহূর্তেই মুছে গেল।
নতুন সম্পর্কের ব্লুপ্রিন্ট
শায়ান আলতো করে অরুণিমাকে ছাড়িয়ে একটু দূরে সরে গেল। “এই প্রতিযোগিতা আমাদের একটা কঠিন শিক্ষা দিল, অরুণিমা। আমরা দু’জনই সেরা, কিন্তু আমরা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নই। আমাদের দু’জনের চিন্তা, দক্ষতা—সবকিছুই একে অপরের পরিপূরক।”
“তুই ঠিক বলেছিস শায়ান,” অরুণিমা স্বীকার করল। “আমি উচ্চাকাঙ্ক্ষী, কিন্তু অন্ধ। আমি ভুলে গিয়েছিলাম যে আমাদের প্রথম স্বপ্ন ছিল একসাথে কাজ করা। খ্যাতি অর্জন করতে গিয়ে আমি তোকে হারাতে বসেছিলাম।”
শায়ান অরুণিমার হাত ধরল। “আমরা দু’জনেই এই প্রজেক্টের জন্য সেরা নকশা জমা দিয়েছিলাম। আর ক্লায়েন্টের কথা মনে আছে? তারা আমাদের দু’জনকেই এই প্রজেক্টে একসাথে দেখতে চেয়েছিল।”
যৌথ পথের অঙ্গীকার
কয়েক সপ্তাহ পর। অরুণিমা এবং শায়ান মি. ভার্মার সঙ্গে আলোচনায় বসলো। আলোচনা ফলপ্রসূ হলো। ক্লায়েন্টের ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে, অরুণিমার ফার্ম ‘সেন অ্যান্ড সন্স’ এবং শায়ানের ফার্ম ‘এপিয়াস ডিজাইন স্টুডিও’ একটি বিশেষ চুক্তিতে আবদ্ধ হলো।
সিদ্ধান্ত হলো, শায়ানের প্রযুক্তিগত দক্ষতা অরুণিমার শৈল্পিক নকশার সাথে যুক্ত হবে। তারা একটি নতুন যৌথ পরামর্শদাতা দল হিসেবে ‘গঙ্গা টাওয়ার’-এর কাজ করবে। ভবিষ্যতে তারা দু’জন মিলে একটি নতুন ফার্ম খোলারও পরিকল্পনা করল, যার স্লোগান হবে: “যেখানে প্রেম ও দক্ষতা মিলেমিশে নকশা তৈরি করে।”

মি. সেন খুশি হয়ে অরুণিমাকে বললেন, “অরুণিমা, তুমি শুধু একটা প্রজেক্ট জেতোনি, তুমি একটা নতুন পথের দিশা দেখিয়েছ। প্রেম আর পেশা—দুটোকেই একসাথে ধরে রাখা যায়, যদি সম্পর্কটা বিশ্বাসের ভিত্তির ওপর মজবুত হয়।”
সমাপ্তি: দ্বন্দ্বরেখা থেকে মিলিত পথ
এক বছর পর। ‘গঙ্গা টাওয়ার’-এর কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। একদিন বিকেলে, অরুণিমা এবং শায়ান তাদের নতুন প্রজেক্টের সাইটে দাঁড়িয়েছিল। সূর্য তখন হুগলি নদীর ওপর অস্ত যাচ্ছে, আর তাদের নকশা করা কাঁচের টাওয়ারে সেই আলো প্রতিবিম্বিত হচ্ছে।
অরুণিমা হাসিমুখে শায়ানের দিকে তাকাল। “এখনও মনে আছে, কলেজের ছাদে সেই প্রতিশ্রুতির কথা? আমরা একসাথে সেরা হব।”
শায়ান অরুণিমাকে কাছে টেনে নিল। “আমরা হয়েছি, অরুণি। আমরা একে অপরের ঢাল আর নকশার কাঠামো। আমরা শিখেছি, যখন আমরা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে চাই, তখনই ‘দ্বন্দ্বরেখা’ তৈরি হয়। আর যখন একে অপরের শক্তি হতে চাই, তখনই সেই রেখাগুলি মিলে গিয়ে একটি নিখুঁত নকশা তৈরি করে।”
প্রেম আর পেশা, দু’টি রেখা আজ তাদের জীবনে এক হয়ে গেছে। আকাশের শেষ আলোয় তাদের সেই নিখুঁত নকশা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তারা বুঝল, প্রেম সবকিছুর ঊর্ধ্বে—এটি শুধু প্রতিযোগিতা জেতার মন্ত্র নয়, বরং জীবনের সবথেকে বড় কাঠামোগত শক্তি।
