ভুলুর কীর্তি
(পাঁচটি মজার ঘটনা সম্বলিত একটি হাস্যরসাত্মক গল্প)
ভুলু গ্রামের এক অদ্ভুত চরিত্র। লম্বায় ছোটখাটো, চোখে চশমা, কিন্তু মাথায় নানারকম বুদ্ধি খেলতে থাকে। তবে সেই বুদ্ধির ফলাফল সবসময় হাস্যকর বিপত্তি তৈরি করে। গ্রামবাসীর কাছে ভুলু সমান মজার, সমান বিরক্তিরও কারণ। তবু ভুলুকে ছাড়া যেন গ্রামটাই ফাঁকা ফাঁকা লাগে।
আজকের এই গল্পে থাকবে ভুলুর পাঁচটি কীর্তি—যা একদিকে আপনাকে পেট ধরে হাসাবে, আবার অন্যদিকে ভাবাবে, “এমন মানুষও আছে নাকি!”
প্রথম কীর্তি : পুকুরে মাছ ধরার ধামাকা
ভুলুর বড় শখ মাছ ধরা। কিন্তু সে যে মাছ ধরতে গিয়ে গ্রামে হাসির খোরাক হবে, তা সে জানত না।
একদিন সে ঠিক করল গ্রামের বড় পুকুরে সবাই মিলে মাছ ধরবে। অন্যরা জাল ফেলে বা ছিপ দিয়ে মাছ ধরে, আর ভুলু ভাবল—“আমি একটু নতুন বুদ্ধি খাটাই।”
সে বাড়ি থেকে বালতির পর বালতি করে ময়দার মণ্ড নিয়ে এল। তারপর পুরো পুকুরে ছিটিয়ে দিল, ভেবে যে—মাছেরা এসে মণ্ড খেয়ে উপরে ভেসে উঠবে।
কিছুক্ষণ পর সত্যিই জলের উপরে অনেক মাছ ভেসে উঠল, কিন্তু মৃত অবস্থায়! গ্রামের লোক হইহই শুরু করল। বুঝা গেল ভুলুর ময়দার মণ্ডে নুন-গোলমরিচ মিশে গিয়েছিল, মাছগুলো শ্বাস নিতে না পেরে মারা গেছে।
গ্রামের মোড়ল রেগে বলল,
—“ভুলু, তোর মাথা আছে তো? পুকুরের মাছ শেষ করে দিলি!”
ভুলু মাথা চুলকিয়ে উত্তর দিল,
—“আমি তো ভাবছিলাম সবাই আজ ভুরিভোজ করবে!”
ফলাফল—পুকুরের মাছ কমে গেল, ভুলু পেল গ্রামে “মণ্ড–বিজ্ঞানী” নাম।
দ্বিতীয় কীর্তি : হাটে হাঁস বেচার কাণ্ড
ভুলুর মা তাকে বললেন, “হাঁসগুলো নিয়ে হাটে যা, বিক্রি করে টাকা নিয়ে আস।”
ভুলু হাঁসগুলো বাঁশের খাঁচায় ভরে নিয়ে গেল। কিন্তু হাটের মাঝপথে হঠাৎ তার মাথায় এল নতুন আইডিয়া—“যদি হাঁসগুলোকে বেলুনের মতো আকাশে ওড়ানো যায়, তাহলে মানুষ মজা পাবে, দামও বেশি দেবে।”
সে হাঁসের গলায় লাল-নীল ফিতা বেঁধে দিল, আবার কারও কারও পিঠে রঙিন কাগজ আটকিয়ে দিল। হাঁসগুলোকে খাঁচা থেকে ছাড়তেই তারা চারদিকে দৌড়াদৌড়ি শুরু করল। কেউ পুকুরে ঝাঁপ দিল, কেউ আবার লোকজনের ঝুড়ি উল্টে দিল।
হাটে হইচই পড়ে গেল। ক্রেতারা রাগ করে ভুলুকে ধাওয়া দিল। শেষে এক বুড়ো লোক বলল—
—“বাবা, হাঁস বিক্রি করতে এসে সার্কাস বানালি?”
ভুলু হেসে উত্তর দিল,
—“দেখলেন না কেমন আকর্ষণ তৈরি হলো? এটাই আমার মার্কেটিং!”
সেদিন হাঁসগুলো ঠিকমতো বিক্রি হলো না, কিন্তু গ্রামে ফেরার পর সবাই তাকে ডাকল “হাঁসের সার্কাসওয়ালা ভুলু।”
তৃতীয় কীর্তি : ভূত ধরার অভিযান
গ্রামের মানুষ বহুদিন ধরেই গুজব ছড়াচ্ছিল—পুরনো বটগাছটার নিচে রাতে নাকি ভূত দেখা যায়। কেউ বলে, সাদা কাপড়ে মোড়া ছায়া নড়ে, কেউ আবার বলে মাথা উল্টে হাঁটে।
ভুলু এমন গল্প শুনে একেবারে ফুঁসতে লাগল। বুক চাপড়ে বলল—
—“ভূত? ওসব কিছু নেই! আজ রাতে আমি নিজেই ভূত ধরে আনব।”
প্রস্তুতি
রাত নামার পর ভুলু একেবারে সেনানীর মতো প্রস্তুত হলো।
- মাথায় লাল গামছা বেঁধে নিল।
- হাতে লণ্ঠন, কোমরে লাঠি।
- আর সঙ্গে আনল এক বিশাল কড়াই, ভেতরে জ্বালানো ধূপকাঠি।
- অতিরিক্ত আকর্ষণের জন্য লাল রঙের টর্চ লুকিয়ে রাখল।
গ্রামের কয়েকজন ছেলে লুকিয়ে লুকিয়ে তার পিছু নিল—দেখবে আসলেই ভূত ধরা পড়ে কি না।
অভিযানের শুরু
বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে ভুলু উচ্চস্বরে ঘোষণা দিল—
—“এগিয়ে আয় ভূত! আজ তোর ছুটি করব।”
ঠিক তখনই ওপরে বসা একটা পেঁচা ডেকে উঠল—“হুঁ… হুঁ…”।
ভুলু ভয়ে কেঁপে উঠল, কিন্তু মান বাঁচাতে চেঁচিয়ে বলল—
—“হা হা! বুঝলে? ভূত এসে গেল।”
সে টর্চ জ্বালিয়ে লাল আলো কড়াইয়ের ভেতরে ফেলল। দূর থেকে দেখতে লাগল যেন আগুনের মধ্যে নাচছে অদ্ভুত ছায়া। গ্রামে যারা লুকিয়ে দেখছিল, ভয়ে দৌড়ে পালাল।
অঘটন
হঠাৎ পাশের একটা ছাগল দৌড়ে এসে কড়াই উল্টে দিল। ধূপকাঠি ছড়িয়ে আগুন ধরল। ভুলু চিৎকার করে উঠল—
—“বাঁচাও! ভূত আমায় পুড়িয়ে মারছে!”
চারদিকে হইচই পড়ে গেল। গ্রামবাসী দৌড়ে এসে আগুন নেভাল।
সত্য উদঘাটন
পরে সবাই জানল “ভূত” আসলে ছাগল ছাড়া আর কিছু নয়। গ্রামবাসী হেসে গড়িয়ে পড়ল। আর ভুলুর নতুন নাম হলো—
“ভূত শিকারি ভুলু।”
চতুর্থ কীর্তি : স্কুলে শিক্ষক সেজে
ভুলুর বয়স তিরিশ পেরিয়েছে, তবু পড়াশোনায় তার মন নেই। কিন্তু একদিন সে মজা করার জন্য স্কুলে ঢুকে গেল।
সেদিন শিক্ষক দেরি করছিলেন। ভুলু চক হাতে নিয়ে বোর্ডে লিখল, “আজ আমি তোমাদের নতুন স্যার।”
ছাত্ররা প্রথমে হেসে দিল, কিন্তু ভুলু গম্ভীর গলায় বলতে লাগল, “আজকের পাঠ—কীভাবে বুদ্ধি খাটিয়ে চালাক হওয়া যায়।”
সে পড়াতে শুরু করল—
১. যদি গরু পালাতে চায়, তার লেজ বেঁধে রাখো।
২. যদি গরম লাগে, নদীতে ঝাঁপ দাও।
৩. যদি পরীক্ষায় উত্তর না জানো, মুখ গম্ভীর করে বসে থাকো—স্যার ভাববেন তুমি চিন্তা করছ!

শিক্ষক এসে দেখলেন পুরো ক্লাস হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে। ভুলুকে ধরে বাইরে বার করে দিলেন।
সেই দিন থেকে ভুলুকে ডাকা হয়—“অস্থায়ী স্যার।”
পঞ্চম কীর্তি : বিয়ের প্যান্ডেলে গোলমাল
গ্রামের এক আত্মীয়ের বিয়ে। সারা গ্রামে আনন্দ–উৎসবের ঢেউ, সবাই ব্যস্ত কেউ সাজসজ্জায়, কেউ রান্নায়, কেউ আবার বারাত সামলাতে।
ভুলু তখন একেবারে খুশিতে আত্মহারা। সে ঘোষণা দিল—
—“এই বিয়ে আমি আলাদা করে স্মরণীয় করে রাখব!”
ভুলুর দায়িত্ব
আতশবাজি ফাটানোর দায়িত্ব তাকে দেওয়া হলো। অন্যরা ভেবেছিল সাধারণ কিছু বাজি ফাটানোই যথেষ্ট। কিন্তু ভুলুর মাথায় তখন অন্য হিসেব।
সে গোপনে নিজের তৈরি “ধোঁয়া বোমা” মিশিয়ে ফেলল আতশবাজির সঙ্গে। তার যুক্তি ছিল—
“বারাত যখন আসবে, চারপাশে ধোঁয়া ছড়িয়ে গেলে মনে হবে সিনেমার নায়কের এন্ট্রি হচ্ছে!”
বিয়ের দিনে কাণ্ড
বারাত এলো, সবাই নাচছে–গাইছে। ভুলু গর্ব করে প্রথম আতশবাজি জ্বালাল। সঙ্গে সঙ্গে চারপাশ অন্ধকার ধোঁয়ায় ঢেকে গেল।
- বর কাশতে কাশতে বসে পড়ল,
- কনে পক্ষ আতঙ্কে চেঁচাতে লাগল,
- রান্নাঘরের হাঁড়িতে ধোঁয়া ঢুকে ভাত আধপাকা থেকে গেল,
- অতিথিরা কেউ কাউকে চিনতেই পারল না!
প্যান্ডেলজুড়ে হুলস্থুল কাণ্ড।
ভুলুর গর্ব
সবাই যখন দিশেহারা, ভুলু তখন বুক ফুলিয়ে বলল—
—“কী দারুণ দৃশ্য! দেখলেন না, মেঘের ভেতর থেকে নায়কের মতো এলো বর! একেবারে সিনেমার মতো এন্ট্রি!”

পরিণাম
অতিথিদের রাগ দেখে তাকে শেষে রান্নাঘরে পাঠানো হলো—ভালো করে হাঁড়ি মাজতে। পুরো গ্রামে হাসাহাসি চলল। আর ভুলুর নতুন নাম হলো—
“বিয়ের ধোঁয়াবাজ ভুলু।”
ভুলু আসলেই অদ্ভুত চরিত্র। তার প্রতিটি কাজের মধ্যে বোকামি থাকলেও সেই বোকামিই গ্রামে হাসির খোরাক জোগায়।
মাছ ধরা থেকে শুরু করে হাঁস বেচা, ভূত ধরা থেকে শিক্ষক সেজে থাকা, এমনকি বিয়ের প্যান্ডেলে গোলমাল—ভুলুর প্রতিটি কাণ্ডে আছে মজার ছড়াছড়ি।
তাই গ্রামবাসীরা যতই তার উপর রাগ করুক, শেষমেশ সবাই একমত—“ভুলু ছাড়া গ্রাম একেবারেই ফাঁকা।”
